হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমামে যামানা মুহাম্মাদ আল মাহদী (আ.ফা.)’র সম্পর্কিত জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে “একটি আদর্শ সমাজের পথে” শীর্ষক ধারাবাহিক মাহদাভিয়াত আলোচনার এই পর্বটি সম্মানিত পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো:
মাহদাভিয়াতের প্রভাব ও অপব্যবহার
ব্যক্তি ও সমাজজীবনে “মাহদাভিয়াত”-এর প্রভাব ও গুরুত্ব কারও অজানা নয়। মুসলমানরা—বিশেষত শিয়ারা—এ বিশ্বাসকে তাদের অন্যতম মৌলিক আকিদা হিসেবে গণ্য করে থাকে।
স্বাভাবিকভাবেই, যে বিশ্বাস মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয় এবং সত্যের কাছাকাছি অবস্থান করে, অসাধু ও সুযোগসন্ধানী মানুষ সেটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ বেশি খোঁজে।
মাহদাভিয়াতের শিক্ষা তার শক্তিশালী আবেদন ও ব্যাপক প্রভাবের কারণে বহুবার বিকৃতির শিকার হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই মাহদাভিয়াতকে কেন্দ্র করে নানা বিভ্রান্তিকর দল ও মতবাদের জন্ম হয়েছে। এসব বিচ্যুতি এবং তার পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা ভবিষ্যতে একই ধরনের বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মিথ্যা প্রতিনিধিত্বের দাবি— মারাত্মক বিচ্যুতির সূচনা
ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর শাহাদাত এবং গায়বাতে সুগরার সূচনার পর সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাসুম ইমামের সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তখন “বিশেষ প্রতিনিধি” বা নির্দিষ্ট নায়েবগণ শিয়াদের পথনির্দেশনা ও নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর অনুসারীদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করেন।
এ সময় কিছু দুর্বল ঈমানের ও বিভ্রান্তচিন্তার মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মিথ্যাভাবে ইমামে গায়েব (আ.ফা.)-এর প্রতিনিধিত্বের দাবি করতে শুরু করে।
এ ধরনের মিথ্যা দাবির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ঈমানের দুর্বলতা
এ ধরনের মিথ্যা দাবির অন্যতম প্রধান কারণ হলো দুর্বল ঈমান। কারণ যার ঈমান দৃঢ়, সে কখনোই মাসুম ইমামের নির্দেশনা থেকে বিচ্যুত হয়ে ভ্রান্ত পথে পা বাড়ায় না।
এ ধরনের ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিল “শালমাগানি”। সে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বাগদাদের একজন প্রসিদ্ধ আলেম, লেখক ও হাদিসবিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। তার বহু গ্রন্থ ছিল, যেখানে আহলুল বাইত (আ.)-এর অসংখ্য বাণী উদ্ধৃত হয়েছে।[রিজালুন নাজাশি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩৯]
কিন্তু পরবর্তীতে সে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে এবং চিন্তা, আকিদা ও আচরণে ভয়াবহ বিকৃতি সৃষ্টি করে। এমনকি বর্ণিত হাদিসেও নিজের ইচ্ছামতো সংযোজন-বিয়োজন করতে শুরু করে। নাজাশি তার “রিজাল” গ্রন্থে এ বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করেছেন।
[শাইখ তুসি, আল-ফিহরিস্ত, পৃষ্ঠা ৩০৫; রিজালুন নাজাশি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯৪]
২. ইমামের সম্পদের প্রতি লোভ
গায়বাতে সুগরার যুগে কিছু লোক ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর সম্পদ প্রকৃত প্রতিনিধি বা নায়েবের কাছে পৌঁছে না দেওয়ার উদ্দেশ্যে “নিয়াবত” ও “বাবিয়াত”-এর দাবি করে।
“আবু তাহির মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে বিলাল” ছিল এমনই একজন ব্যক্তি, যে সম্পদ ও ধন-সম্পদের লোভে “বাবিয়াত”-এর দাবি তোলে।
প্রথমদিকে সে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর নিকট একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল এবং তার কাছ থেকে হাদিসও বর্ণনা করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে গিয়ে সে বিভ্রান্তির পথে পা বাড়ায় এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর পক্ষ থেকে নিন্দিত হয়।
সে দাবি করে যে, সে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর প্রতিনিধি। এমনকি ইমামের দ্বিতীয় নায়েবের প্রতিনিধিত্বও অস্বীকার করে এবং ইমামের নিকট পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংগৃহীত সম্পদ আত্মসাৎ করে।
[কিতাবুল গাইবা, পৃষ্ঠা ৪০০]
৩. খ্যাতি লাভের আকাঙ্ক্ষা
খ্যাতিলিপ্সাও ভ্রান্ত বিশ্বাস ও মনগড়া মতবাদের জন্ম দেওয়ার একটি বড় কারণ। নিজেকে বড় করে দেখানো এবং মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রবল আকাঙ্ক্ষা একটি নিন্দনীয় নৈতিক বৈশিষ্ট্য, যা মানুষকে বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক পথে পরিচালিত করে।
৪. রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
মিথ্যা “বাবিয়াত”-এর দাবিদারদের আবির্ভাবের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শত্রুরা কখনো সরাসরি, আবার কখনো পরোক্ষভাবে—শিয়াদের বিশ্বাস দুর্বল করা এবং তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করার জন্য—কিছু মানুষকে “বাবিয়াত”-এর দাবিতে উৎসাহিত করেছে।
এ উদ্দেশ্যে তারা কিছু ব্যক্তিকে নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে তোলে এবং তাদেরকে “বাব” হওয়ার দাবি করতে নির্দেশ দেয়। এরপর সর্বাত্মক সহায়তার মাধ্যমে তাদের প্রচার চালায়।
এর অন্যতম উদাহরণ হলো “সাইয়্যিদ আলী মুহাম্মদ শিরাজি” (১২৩৫-১২৬৬ হিজরি), যে “বাবি” মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা এবং তার অনুসারীদের কাছে “বাব” নামে পরিচিত।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মাহদাভিয়াতের মতো গভীর ও হৃদয়স্পর্শী আকিদাকে কেন্দ্র করে বহু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ব্যক্তিস্বার্থ, সম্পদ, খ্যাতি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মিথ্যা দাবির আশ্রয় নিয়েছে। তাই এ ধরনের বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে হলে সহিহ আকিদা, নির্ভরযোগ্য আলেমদের দিকনির্দেশনা এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর বিশুদ্ধ শিক্ষার সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থাকা অপরিহার্য।
এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…
উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’— খোদা-মুরাদ সোলাইমান (সামান্য সম্পাদনাসহ)
আপনার কমেন্ট